Friday, May 18, 2012

একজন রেজিয়ার সাফল্যের গল্প

রেজিয়া বেগম ময়মনসিংহ জেলার নান্দাইল উপজেলায় এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তার পিতার নাম আব্দুল হামিদ । গ্রামের আর দশটি ছেলে মেয়ের মতো বেড়ে উঠা হয়নি তার। দরিদ্র হওয়ায় তাদের সংসারে অভাব অনটন লেগেই থাকত। তাই লেখাপড়া করা হয়নি তার । উপরন্ত ঠিক মত না খেতে পেয়ে অপুষ্টির স্বীকার হন তিনি। শিশু ও নারী অধিকার ভোগতো দূরের কথা, নানা রকম সামাজিক বঞ্চনার ভেতর দিয়ে বেড়ে উঠেন।      
মাত্র ১২(বার) বছর বয়সে নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার বড়তলী গ্রামের
আব্দুল আলীর ছেলে আব্দুল খালেকের সাথে তার বিয়ে হয় । সতীনের ঘরে এসে বেশী  দিন সুখি হতে পারেনি। বিয়ের  এক বছর পর রেজিয়ার কুল জুরে আসে পুত্র সন্তান। তার পর স্বামী ও সতীন মিলে জোর করে  তাকে অপারেশন করিয়ে দেয়, যাহাতে আর  সন্তান না হয়। তার পর থেকে তার উপর নেমে আসে অমানুসিক নির্যাতন। স্বামী ও সতীনের নির্যাতন সইতে না পেরে ছেলে কে সাথে নিয়ে চলে আসেন বাবার বাড়িতে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস গেলেও তার স্বামী, স্ত্রী ও সন্তানের কোন রকম খোজখবর না নওয়ায় তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়।
শুর হয় এক মাত্র ছেলেকে  নিয়ে বেচে থাকার জীবন সংগ্রাম। এর এক বছর পর বড়তলী গ্রামের ধনী পরিবারের এক ছেলে তাইজুল ইসলাম  তার পরিবারকে না জানিয়ে রেজিয়াকে বিবাহ করেন। কিন্তু তাইজুলের পিতা তাদের এ বিবাহ মেনে নেয়নি এবং বাড়ীতে স্থান দেননি। রেজিয়া বেগম অন্যের বাড়িতে  আশ্রয় নেয় । মানুষের বাড়ীতে ঝি এর কাজ করে চলতে থাকে তার জীবন। স্বামী তাইজুল  তার বাবার বাড়ীতেই থেকে যায় এবং রেজিয়ার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় নতুন পথের সন্ধান শুরু করেন তিনি।

ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন এ সময় বড়তলী গ্রামে মাইক্রোফিন্যান্স কর্মসূচীর মাধ্যমে দারিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কাজ করছিল। রেজিয়া বেগম ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশনের বড়তলী মহিলা উন্নয়ন দলের সদস্য হন । ১ম দফায় ৩০০০/(তিন হাজার ) টাকা ঋণ গ্রহন করেন। ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন কর্তৃক হাঁস মুরগী পালনের উপর তিন দিনের প্রশিনের সুযোগ পান রেজিয়া বেগম। ২য় দফা ৫০০০/(পাঁচ হাজার) টাকা ঋণ নিয়ে ১০০(একশত) হাঁসের বাচ্চা কিনে পালতে শুরু করেন। হাঁস গুলো বড় হয়ে যখন ডিম দিতে শুরু করে রেজিয়া বেগমের মুখে হাসি ফুটে উঠে এবং আসায় বুক বাধেন। এসময় তার ২য় স্বামী তাইজুল তার পাশে এসে দাড়ায়। রেজিয়া হাসের ডিম বিক্রি করে স্বামীকে একটি রিক্সা কিনে দেন। এভাবে আয় বাড়তে থাকে তার। ৩য় দফা ৮০০০/(আট হাজার) টাকা ঋণ নিয়ে আরও ১০০(একশত) হাঁসের বাচ্চা এবং ১০(দশ) শতাংশ জমি ক্রয় করেন এবং মানুষের নিকট থেকে বাঁশ ও খর চেয়ে এনে একটি ঘর তৈরী করেন। এপর তিনি ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন এর মাইক্রো-এন্টারপ্রাইজ প্রোগ্রামে অন্তর্ভূক্ত হয়ে ১৮০০০/ (আঠার হাজার) টাকা ঋণ গ্রহন করে ৫০০/(পাচঁশত) হাসের বাচ্চা ক্রয় করেন। এসময অসুখে ২০০(দুইশত) হাসে তি হলেও থেমে যাননি রেজিয়া। আগের ২০০(দুইশত )বর্তমানের ৩০০(তিনশত) মোট ৫০০(পাঁচশত) হাঁস ডিম দেওয়া শুরু করলে নতুন করে বাচার স্বপ্ন দেখেন তিনি।
এবছর তার হাঁস পালনে খরচ হয় ২৫০০০০/(দুই লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা এবং ডিম বিক্রি হয় ৪০০০০০/(চার লক্ষ)টাকা এত লাভ হয় ১৫০০০০/(এক লক্ষ পঞ্চাম হাজার)টাকা । তিনি ঋণের টাকা সময়মত পরিশোধ করেন এবং উদ্বৃত টাকা দিয়ে স্বামীকে মটর সাইকেল কিনে দেন ভাড়ায় চালানোর জন্য। এতে তার বাড়তি আয় হতে থাকে। পরে ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন থেকে ৫০০০০/(পঞ্চাশ হাজার) টাকা ঋণ গ্রহন করে আরও ৭৫০(সাতশত পঞ্চাশ)টি হাঁসের বাচ্চা ক্রয় করেন। বর্তমানে হাঁসের সংখ্যা দাড়ায় মোট ১১৫০(এক হাজার পঞ্চাশ) টি। এ পর্যয়ে তর খরচ হয় ৫০০০০০/(পাঁচ লক্ষ) টাকা এবং ডিম থেকে আয় হয় ৭৫০০০০/ (সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা। মটরসাইকেলের আয় এবং ডিমের আয় দিয়ে সে একটি আধা পাকা টিনসেট ঘর নির্মান এবং ২.৫ শতাংশ জমি ক্রয় করেন। বর্তমানে তিনি ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন থেকে ঋণ গ্রহন ১৫০০০০/(এক লক্ষ পঞ্চাশ হাজার) টাকা।
এক সময যার কিছু ছিল না তার অক্লান্ত পরিশ্রম , মেধা এবং ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন এর সহযোগিতায় তার জমি বাসস্থান, বিনোদনের জন্য টেলিভিশন, সিডি, গরু , ছাগল সবই হয়েছে। বর্তমানে তার মোট সম্পদের পরিমান প্রায় ১৫০০০০০/(পনের লক্ষ) টাকা।
আগে যারা দূরে ছিলেন শশুর শাশুড়ী  তারা সবাই এখন তার নিকট আসেন গ্রামের অনেক মহিলা তার নিকট থেকে পরামর্শ নেন। রেজিয়া বেগম এখন সকলের সাথে মিলেমিশে  আনন্দে দিন কাটাচ্ছেন। সততা আর অধ্যবসায়ের ফলে একেবারে শূন্য হতে আজ এমন সচ্ছল জীবনে উঠে আসতে পেরেছেন রেজিয়া বেগম । একজন সফল উদ্যোগী নারী হিসাবে তিনি এখন এলাকার নারীদের কাছে এক উজ্জ্বল মুখ।

লিখেছেন : মোঃ রুহুল আমিন খান
মোবাইল : ০১৭১৮৭৩৯৯০৭





No comments: